ধানের ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগ কি এবং এর প্রতিকার।

ধান চাষ করতে গেলে চাষিদের বা কৃষকদের নানা রকমের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। তার মধ্যে ধানের ফসলে ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ অন্যতম। ফসল ধানের ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগ দ্বারা আক্রান্ত হলে ফসলের মারাত্মক ক্ষতি হয়ে থাকে। তাই এই পোস্টে আমরা জানবো ধানের ফসলে কোন কোন ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করে এবং এর প্রতিকার সম্পর্কে।

ধানের ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগ ।

ধানের ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগ গুলো দ্বারা ফসল আক্রান্ত হলে ফসলের মারাত্মক ক্ষতি হয়ে থাকে। এ রোগ ধান চাষে গুরুতর একটি সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। ধানের ফসল এ রোগ গুলো দ্বারা আক্রান্ত হলে ধানের উৎপাদনশীলতা বেশ হ্রাস পায়। যার ফলে ফসলের ফলন একেবারেই কমে যায়।

এতে করে কৃষকদের গুরুতর আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। এ ধানের ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগ গুলো ধানের চারাগাছের পাতা, কান্ড এবং চারাগাছের শিকড়ের মধ্যে আক্রমণ করে থাকে। যার ফলে চারাগাছ গুলো খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে মরে যেতে শুরু করে।

পড়ুন: ধানের কারেন্ট পোকা দমনের ঔষধ 

ধানের ব্যাকটেরিয়া রোগ গুলো খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে পুরো ফসলে ছড়িয়ে পরতে পারে। যার কারনে ধানের চারাগাছে ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ গুলো বেশ জোড়ালো হয়ে থাকে। ধানের ব্যাকটেরিয়া জনিত অনেক ধরনের রোগ রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি রোগের নাম নিচে তুলে ধরা হলো।

ধানের ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগ গুলো হলো:

  1. ধানের পাতা পোড়া রোগ।
  2. ধানের পাতার লালচে রেখা রোগ।
  3. ধানের ব্লাইট রোগ।
  4. ধানের গুড়ি পঁচা রোগ।
  5. ধানের উফরা রোগ।

এই রোগ গুলো ছাড়াও আরও নানা রকমের ধানের ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগ রয়েছে। তবে ধানের ফসলে সাধারণত এই ব্যাকটেরিয়া গুলো বেশি আক্রমণ করে থাকে। এ রোগ গুলোর যেকোন একটি দ্বারা ফসল আক্রান্ত হলে চারাগাছের মারাত্মক ক্ষতি করে থাকে। তাই ধানের ফসল এই ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগ গুলো দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার আগে সতর্ক হতে হবে।

ধানের ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগের লক্ষণ ।

ধান চাষ করতে গেলে দেখা যায় ধানের ফসল নানা রকমের ধানের ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগ দ্বারা আক্রান্ত হয়। এই রোগ গুলো দানের ফসলের বেশ ক্ষতি সাধন করে থাকে। তাই এই ব্যাকটেরিয়া গুলোর যেকোন একটি দ্বারা ফসল আক্রান্ত হলে এর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে।

এ ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া রোগ দমন করতে এ রোগের ঔষধ ফসলে প্রয়োগ করতে হবে। তবে ঔষধ প্রয়োগ করার আগে সঠিকভাবে জানতে হবে যে ফসলে ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করেছে কিনা। ফসল ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত হলে বেশ কিছু লক্ষণ দেখা যায়।

ধানের ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগের লক্ষণ গুলো নিচে উল্লেখ করা হলো:

  • ধানের চারাগাছ ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত হলে প্রথমমত চারাগাছের পাতা হলুদ হয়ে যায়।
  • বিশেষ করে চারাগাছের পাতার কিনারা থেকে হলুদ হয়ে পুরো পাতায় হলদে রং ছড়িয়ে পরে।
  • ব্যাকটেরিয়া আক্রান্ত ধানে চারাগাছের পাতায় লম্বা বাদামী বর্ণের ধূসর দাগ দেখা যায়।
  • ব্যাকটেরিয়া আক্রান্ত ধানে চারাগাছের পাতায় পচা গন্ধ বের হতে পারে।
  • ব্যাকটেরিয়া আক্রান্ত ধানে চারাগাছের পাতার কিনারায় পানি ভেজা দাগ পরে যা হলদে রংয়ের হয়ে থাকে।
  • আক্রান্ত পাতর মধ্যে বাদামী বর্ণের লম্বা সরু সরল দাগ পরে যায় যা ধীরে ধীরে পুরো পাতায় ছড়িয়ে পরে।
  • আক্রান্ত ধানের চারাগাছের যেকোনো অংশে কালো এবং বাদামী বর্ণের ছোট ছোট দাগ পরে যায় ইত্যাদি।

যদি ধানের চারাগাছে উল্লেখিত লক্ষণ গুলোর দু’একটি আপনার ফসলে প্রকাশ পায় তাহলে বুঝতে হবে যে ফসলে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ হয়েছে।

ধানের ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগ প্রতিরোধের উপায়।

ফসলে ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করলে ফসলের বেশ ক্ষতি হয়ে থাকে। যার কারনে দ্রুত সময়ের মধ্যে এ রোগের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহন করতে হয়। এ রোগ প্রতিরোধের বেশ কিছু উপায় রয়েছে। নিচে সে প্রতিরোধ মূলক ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করা হলো।

ধানের ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগ প্রতিরোধের উপায় গুলো হলো:

  • চাষের শুরুতেই সবচেয়ে বেশি রোগ প্রতিরোধী জাতের ধান চাষ করতে হবে।
  • ধানের চারাগাছ গুলো যদি ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত হয়ে যা তবে আক্রান্ত চারাগাছ গুলো সরিয়ে ফেলতে হবে।
  • ধানের ফসলের জমিতে পানি নিষ্কাশনের বেশ ভালো ব্যবস্থা করতে হবে।
  • ধানের ফসলের জমির চারপাশের আগাছা ভালো করে পরিষ্কার করতে হবে।
  • বিশেষ করে জমির আইলের আগাছা গুলো পরিষ্কার করে দিতে হবে এবং জমি নিয়মিত পরিদর্শন করতে হবে।
  • জমিতে পূর্বে চাষ করে থাকলে প্রথমে সে ফসলের অবশিষ্টাংশ জমি থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে বা পুড়িয়ে দিতে হবে।
  • এরপর জমি চাষ দিয়ে ধানের চারাগাছ রোপন করতে হবে।
  • জমিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে নাইট্রোজেন সার প্রয়োগ করতে হবে।
  • অনেক সময় দেখা যায় জমিতে নাইট্রোজেন সার প্রয়োগ না করার ফলে ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করে থাকে।
  • ধানের ফসলের জমিতে ধান চাষের পরে অন্যান্য ফসল চাষ করা।
  • যার ফলে মাটিতে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার স্পোর বা জীবাণুর পরিমান অনেকটা কমে যায় এবং ফলন ভালো হয় ইত্যাদি ।

ধানের ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগের ঔষধ।

ফসলে ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করে ফসলের মারাত্মক ক্ষতি করে থাকে। তাই আমরা জানতে চাই ধানের ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগের ঔষধ সম্পর্কে। নিচে ধানের ফসলের ব্যাকটেরিয়া দমনের সবচেয়ে কার্যকরী ঔষধ এর নাম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

ধানের ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগ এর ঔষধের নাম গুলো হলো:

  1. ব্যাকট্রল ২০ ডব্লিউ পি – Bactrol 20 WP
  2. অটোস্টিন ৫০ ডব্লিউ ডি জি – Autostin WDG
  3. ট্রপার ৭৫ ডব্লিউ পি – Trooper 75 WP
  4. ন্যাটিভে ৭৫ ডব্লিউ জি – Nativo 75 WG
  5. দিফা ৭৫ ডব্লিউ পি – Difa 75 WP
  6. জিল ৭৫ ডব্লিউ পি – Zil 75 WP

দানের ফসলে ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ হলে এ ঔষধ গুলোর যেকোনো একরি ব্যবহার করলে দ্রুত সময়ের মধ্যে ফসলের ব্যাকটেরুয়া দমন হতে শুরু করবে। ধানের ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগ ।

ধানের ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগের ঔষধ এর দাম।

উপরে আমরা আলোচনা করেছি ধানের ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগ এর ঔষধ সম্পর্কে। এখন আমরা জানবো উল্লেখিত ঔষধ গুলোর মূল্য।

ধানের ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগের ঔষধ এর দাম নিচে উল্লেখ করা হলো:

  • ব্যাকট্রল ২০ ডব্লিউ পি – Bactrol 20 WP : ব্যাকট্রল ২০ ডব্লিউ পি কিটনাশকটির মূল্য ১০০ গ্রাম ১২০ টাকা, ৫০০ গ্রাম ৫৮০ টাকা এবং ১ কেজি ১১০০ টাকা।
  • অটোস্টিন ৫০ ডব্লিউ ডি জি – Autostin WDG : অটোস্টিন ৫০ ডব্লিউ ডি জি কিটনাশকটির মূল্য ৫০ গ্রাম ২০০ টাকা, ১০০ গ্রাম ৩৯০ টাকা এবং ৫০০ গ্রাম ১৭০০ টাকা।
  • ট্রপার ৭৫ ডব্লিউ পি – Trooper 75 WP : ট্রপার ৭৫ ডব্লিউ পি কিটনাশকটির মূল্য ৫০ গ্রাম ৩০০ টাকা, ১০০ গ্রাম ৫৮০ টাকা এবং ২০০ গ্রাম ১১০০ টাকা।
  • ন্যাটিভে ৭৫ ডব্লিউ জি – Nativo 75 WG : ন্যাটিভে ৭৫ ডব্লিউ জি কিটনাশকটির ১০ গ্রাম ১১৫ টাকা, ৫০ গ্রাম ৫৫০ টাক এবং ১০০ গ্রাম ১০৫০ টাকা।
  • দিফা ৭৫ ডব্লিউ পি – Difa 75 WP : দিফা ৭৫ ডব্লিউ পি কিটনাশকটির মূল্য ৫০ গ্রাম ১৫০ টাকা, ১০০ গ্রাম ৩০০ টাকা এবং ৫০০ গ্রাম ৫৮০ টাকা।
  • জিল ৭৫ ডব্লিউ পি – Zil 75 WP : জিল ৭৫ ডব্লিউ পি কিটনাশকটির মূল্য ১০০ গ্রাম ২২০ টাকা এবং ৫০০ গ্রাম ১০৫০ টাকা।

ইত্যাদি ঔষধ গুলোর মূল্য সময় এবং স্থান বেধে কিছুটা আলাদা হতে পারে।

ধনের ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগের ঔষধের ব্যবহার বিধি।

ধানের ফসলে ধানের ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগ এর আক্রমণ হলে সে রোগ থেকে ফসলকে রক্ষা করতে আমরা বিভিন্ন কীটনাশক ব্যবহার করি। অনেক সময় দেখা যায় যে ঔষধ গুলোর সঠিক ব্যবহার না করার ফলে ঔষধের কার্যকারীতা নষ্ট হয়ে যায়।

উল্লেখিত ঔষধ গুলোর ব্যবহার বিধি নিচে উল্লেখ করা হলো:

  • ব্যাকট্রল ২০ ডব্লিউ পি – Bactrol 20 WP : ব্যাকট্রল ২০ ডব্লিউ পি এই কিটনাশকটি প্রতি ১ লিটার পানিতে ২ গ্রাম প্রয়োগ করতে হবে।
  • অটোস্টিন ৫০ ডব্লিউ ডি জি – Autostin WDG : অটোস্টিন ৫০ ডব্লিউ ডি জি এই কিটনাশকটি প্রতি ১ লিটার পানিতে ২ গ্রাম প্রয়োগ করতে হবে।
  • ট্রপার ৭৫ ডব্লিউ পি – Trooper 75 WP : ট্রপার ৭৫ ডব্লিউ পি এই কিটনাশকটি প্রতি ১০ লিটার পানিতে ৮ গ্রাম প্রয়োগ করতে হবে।
  • ন্যাটিভে ৭৫ ডব্লিউ জি – Nativo 75 WG : ন্যাটিভে ৭৫ ডব্লিউ জি এই কিটনাশকটি প্রতি ১০ লিটার পানিতে ৫ গ্রাম প্রয়োগ করতে হবে।
  • দিফা ৭৫ ডব্লিউ পি – Difa 75 WP : দিফা ৭৫ ডব্লিউ পি এই কিটনাশকটি প্রতি ১০ লিটার পানিতে ১০ গ্রাম প্রয়োগ করতে হবে।
  • জিল ৭৫ ডব্লিউ পি – Zil 75 WP : জিল ৭৫ ডব্লিউ পি এই কিটনাশকটি প্রতি ১০ লিটার পানিতে ১৫ গ্রাম প্রয়োগ করতে হবে।

ধানের ফসলে ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করলে সঠিক নিয়মে ঔষধ প্রয়োগ করুন এবং ফসলকে রক্ষা করুন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top